●ডাইরী থেকে●

১৭ই জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী
১২ ডিসেম্বর ২০২২

কানিশাইল এলাকা নিয়ে কিছু লিখার ইচ্ছা জাগলো। আগে ডাইরী লিখতাম নিয়মিত। কানিশাইল কবে এসেছিলাম, এটা খোঁজ করতে গিয়ে লিখিত ৫/৬ টা ডাইরীর মধ্যে ২ টা ডাইরী পুরোটা পড়া হয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ের অনেক স্মৃতি, ঘটনা, সুন্দর মুহূর্ত, যেগুলো ডাইরীতে না লিখলে হয়তো আজীবনের জন্য ভুলে যেতাম। দুঃখের বিষয় হলো, গত দেড়/২ বছর থেকে ডাইরী লেখা হচ্ছে না।

২০১৬ সালে সিলেট আসার পর বিভিন্ন এলাকায় থেকেছি, বলতে গেলে হিমুর মত ছিলাম। প্রথমে কাজিরবাজার মাদরাসায় (হিফজুল কুরআন রিভিশন দেওয়ার জন্য প্রায় চার মাসের মত ছিলাম), তারপর তপুবন, উপশহর কিছুদিন, আম্বরখানায় প্রায় অনেকদিন, এরপর পীরমহল্লা কিছু দিন, সাগরদিঘীরপার ১ মাসের মত। অর্থ্যাৎ ১৬ সালের মধ্যখান থেকে নিয়ে ১৯ সালের মধ্যখান পর্যন্ত তিন বছরে ৬ টা জায়গা পরিবর্তন করেছি। ২০১৯ সালের ২৭ জুন Oliur Rahman ভাইয়ের মাধ্যমে এসেছিলাম এই এলাকায়। যেখানে আগের তিন বছরে ৬ জায়গা পরিবর্তন সেখানে কানিশাইলে অবস্থান প্রায় সাড়ে তিন বছরেরও বেশি। অবশ্যই বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, এখানে কিছু ভিন্ন রকম সুবিধা রয়েছে, যা অন্য এলাকায় হয়তো পাওয়া যায় না। অবশ্যই অলি ভাইয়ের সাথে পরিচয় হওয়ার আগে সিলেট সিটিতে কানিশাইল নামে কোনো এলাকা আছে বলে জানতাম না।

এলাকাটা মূল শহরের জঞ্জাল থেকে একটু দূরে আছে, পুরোপুরি শহরের সুবিধা না পেলেও প্রয়োজনে শহরে যেতেও দেরি হয় না। এলাকার মানুষও দ্বীনদার, বিভিন্ন মতালম্বী মানুষের সহাবস্থান রয়েছে। কানিশাইল আবাসিক এলাকাও প্রায় সেইম। সেখানেও থাকা হয়েছে অনেকদিন। মসজিদের মাইকে ছাত্র-ছাত্রীদের তিলাওয়াত শুনছিলাম, মা-শা-আল্লাহ প্রায় সবার কুরআন পড়াই সহীহ আছে, যা সব এলাকায় দেখা যায় না।

আমার পরে কানিশাইলে এসেছিলেন Nasir ভাই, Amir ভাই, Ubaydullah ভাই, Ismael ভাই, তারা বর্তমানে বিভিন্ন কারণে চলে গেছেন, এমনকি ওলিউর রহমান ভাইও চলে গেছেন, যা খুবই কষ্টদায়ক ছিল আমার জন্য। এখন আছেন আব্দুল্লাহ ভাই, জিল্লু ভাই এবং দিদার ভাই। বাসস্থানের ভালো একটা সুবিধা হওয়াতে আমিও রয়ে গেলাম, আল্লাহর হুকুমে আরও হয়তো কিছুদিন থাকা হবে। তবে যেখানেই যাই এই এলাকার কথা আজীবন স্মরণে থাকবে ইনশাআল্লাহ।

অন্যান্য এলাকার মত এখানেও অনেক স্টুডেন্ট তৈরি হয়েছে। আসলে স্টুডেন্ট পড়ানোটা প্রয়োজন থেকে শখ, তারপর একসময় নেশায় পরিণত হয়ে যায়, যা কিছু উপকারের পাশাপাশি একাডেমিক পড়ালেখারও ক্ষতি করে। অন্য একদিন স্টুডেন্টদের নিয়ে লিখার ইচ্ছা আছে ইনশাআল্লাহ।

এখন আসি ভিন্ন প্রসঙ্গে। এলাকা সম্পর্কে জানার জন্য পড়েছিলাম এই এলাকায় জন্মগ্রহণকারী এডভোকেট মোঃ আব্দুল মুছব্বির সাহেবের 'আমার দেখা পঁচাত্তর বছর' বইটি। কবি Muhammed Imran ভাই লেখকের ভাতিজা, যা বইয়ে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণকারী লেখক পাঠকের সাথে গল্পের ঢঙ্গে প্রচুর বিষয় উল্লেখ করেছেন বইটিতে। যেমন বইয়ে আছে মালুনিছড়ার কথা, কানিশাইল-আখালিয়া হাওর, হাওর এবং মালুনিছড়ার পানি দ্বারা চাষাবাদ, মহল্লার দক্ষিণে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর কথা, মহল্লার মধ্যভাগের গুরুস্থানের কথা, শিশু-কিশোররা ভোরে ফজরের নামাজ পড়ার জন্য গজল গেয়ে মহল্লাবাসিকে জাগ্রত করার ঘটনা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আখালিয়া ও তৎসংলগ্ন মহল্লা বৃটিশ সরকারের অধিগ্রহণ ও যুদ্ধকেন্দ্রিক আরো ঘটনা, সিলেট পাকিস্তানে না হিন্দুস্তানে যোগ দেবে এ বিষয়ে গণভোট, আলী জিন্নাহর সিলেট আগমন, দেশভাগের ফলে সিলেটে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষী-দীক্ষা দ্রুতগতিতে প্রসার হয়েছে, উচ্চশিক্ষার জন্য লেখকের করাচিতে গমন ও সেখানকার বিভিন্ন বর্ণনা, জাহাজে করাচি যেতে ১৪ দিন লেগেছিল, ১ম আট দিনে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্ব বন্দরে পৌছেন, সেখানকার বর্ণনা এবং পুরো সমুদ্র যাত্রার অনুভূতির কথা, করাচিতে ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা হওয়ার ঘটনা, ৭১ এর স্বাধীনতা, মৌলানা আব্দুল হামিদ খানের সাথে দেখা, ৭৫ এর ঘটনা, এরপর আছে পরিবার ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের বর্ণনা, বিভিন্ন সময় অনেক জ্বীনদের সাথে লেখকের সাক্ষাত হয়েছে, তা উল্লেখ রয়েছে, ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, সাহাবী একজন জ্বীনের সাথে লেখকের সাক্ষাত হয়েছে কানিশাইল মসজিদে, সেখানে ৪০ জন লোক উপস্থিত ছিলেন, তারপর আমেরিকা ও যুক্তরাজ্য ভ্রমণ সেখানকার অনেক ঘটনা, তাদের সফলতার কারণ হিসেবে লেখক উল্লেখ করেন, যেহেতু তারা দুনিয়াবি অনেক বিষয়ে সৎ ও দক্ষ তাই আল্লাহ তাদের দুনিয়াই প্রতিদান দিয়ে দিচ্ছেন, ইমান না থাকায় আখিরাতে কোনো প্রতিদান পাবে না, সিলেটের প্রাচীন ইতিহাস, নির্যাতিত মুসলিম ভূমি কাশ্মির ও ফিলিস্তিনের কথা আছে, বিশ্বে অশান্তি সৃষ্টিতে যুগ যুগ ধরে ইহুদীদের তৎপরতা, ১৯৮০ সালে হজ্জ আদায়ের জন্য সৌদিআরব গমন ও সেখানকার বিভিন্ন স্মৃতি ইত্যাদি অনেক বিষয় উল্লেখ রয়েছে বইটিতে। বইটি যেন আমাকে লেখকের সাথে কানিশাইল থেকে নিয়ে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করিয়েছে। বইয়ের অন্যতম দিক হলো, বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনার সাথে সাথে ইসলামের তুলনামূলক আলোচনার দ্বারা লেখকের নাসীহা একজন পাঠককে দ্বীন মানতে অনুপ্রেরণা যোগাবে। বইয়ের শেষদিকে লেখকের রচিত অনেকগুলো কবিতা উল্লেখ রয়েছে। বইটি সম্ভবত Abdur Rahman ভাই দিদার ভাইকে দিয়েছিলেন। এজন্য পড়ার সুযোগ হয়েছে, তাই কৃতজ্ঞতা জানাই উভয়ের প্রতি। কানিশাইলে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি মিস করি প্রিয় আব্দুর রহমান ভাই এবং উবায়দুল্লাহ ভাইকে, একজন ফ্রান্সে এবং অন্যজন পর্তুগাল।
ডাইরীর পুরাতন লেখাগুলো নিয়মিত ফেসবুকে শেয়ার করার ইচ্ছা আছে।

Comments

Popular posts from this blog

আল আবরাত" (العبرات) গ্রন্থের অন্যতম উল্লেখযোগ্য গল্প হলো "ইয়াতিম" (اليتيم)

মুস্তফা লুৎফি আল মানফালুতি

خمارة القط الاسود